শৈশবের অদৃশ্য বোঝা
হরিয়ানার একটা অজ পাড়া গাঁয়ে কয়েকজন গবেষক এমন কয়েকজন মেয়ের সাথে আলোচনাতে বসেছিলেন, যারা নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে চায়। সেই গবেষক দের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার মধ্যে প্রাথমিক ভাবে একটা বিশেষ প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রশ্নটা ছিল একেবারে সাদামাটা— উদ্যোক্তা বা Entrepreneur হতে গিয়ে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা টা কী? সমাজের চোখরাঙানি, বাড়ির অনুমতি, না হাতে টাকার টানাটানি? যা সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশের মহিলাদের ব্যবসা করতে গিয়ে প্রায়ই এই সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আসল বাধাটা বেরিয়ে এল অন্য জায়গা থেকে, সেটা অনেক বেশি ঘরোয়া, অনেক বেশি নিরীহ চেহারায়। তাঁদের দিনের একটা বড় অংশই চলে যায় উনুনের পাশে, বাসন মাজতে, ঘর গোছাতে, এবং সংসারের ছোট-বড় অজস্র কাজে। ব্যবসার সময় খুঁজে বের করবে কখন?
আর সবচেয়ে যে কথাটা গবেষকদের থমকে দিয়েছিল, তা হল— এই মায়েদের মেয়েরাও, ছেলেরা নয় কিন্তু, ইতিমধ্যেই সেই একই কাজে হাত লাগাতে শুরু করে দিয়েছে। রান্নাঘরে মায়ের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে, বাসন এগিয়ে দেওয়া, ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা করা ইত্যাদি কাজ তারা ইতিমধ্যেই করতে শুরু করে দিয়েছে। পরের প্রজন্ম যেন নিঃশব্দেই শিখে নিচ্ছে সেই কঠিন বাস্তবটা, যেখানে সংসার সামলানো যেন একমাত্র মেয়েদের দায়িত্ব। এই শিক্ষা শেখানোর প্রয়োজন ব্যতিত একে অপরের মধ্যে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
এই ছোট্ট পর্যবেক্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতের টাইম ইউজ সার্ভে ২০২৪ (Time Use Survey, পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক তথা MoSPI)-র তথ্য বলছে, এই বিভাজনটা শুরু হয়ে যায় আমরা যতটা ভাবি, তার চেয়েও ঢের আগে থেকে।
এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব এখানেই যে, Indian Council for Research on International Economic Relations বা ICRIER-এর গবেষকেরা এটিকে কেবল পারিবারিক অভ্যাস হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন।
মেয়েদের ক্ষেত্রে বাড়ির কাজ আর দেখভালের কাজে দৈনিক সময় বাড়তে শুরু করে প্রায় দশ বছর বয়স থেকে। এরপর কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের শুরুর দিকটা পর্যন্ত সেই রেখা শুধু উপরের দিকেই উঠতে থাকে, আর তিরিশ বছর বয়সে গিয়ে পৌঁছয় দৈনিক প্রায় ৪৬০ মিনিটে অর্থাৎ সাড়ে সাত ঘণ্টারও বেশি। ভাবলেও অবাক লাগে, এই সময়টা একটা গোটা Office Shift এর সমান সময়, শুধু এখানে মাইনে নেই, ছুটি নেই, "ভালো কাজ করেছ" বলবার মতো কেউ নেই।
উল্টোদিকে সমাজে ছেলেদের ছবিটা? ছয় বছর থেকে পঁচাত্তর বছর বয়স পর্যন্ত— এই গোটা জীবনটাতেই পুরুষদের ঘরকন্নার সময় কখনই পঁয়ষট্টি মিনিটের গণ্ডি পেরোয় না। একজনের জীবনের প্রায় পুরোটাই বাঁধা সংসারের নিঃশব্দ শ্রমে, আর অন্যজনের জীবনে সেই শ্রম কোনোদিন এক ঘণ্টার কোঠাতেই পৌঁছয় না।
এই বৈষম্যটি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আরও স্পষ্ট: TUS 2024 অনুযায়ী, ৬ বছর ও তার বেশি বয়সী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে Unpaid Domestic Services-এ অংশ নেওয়া পুরুষদের গড় সময় ছিল ৮৮ মিনিট, যেখানে মহিলাদের ছিল ২৮৯ মিনিট, অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মহিলারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০১ মিনিট বেশি সময় দেন।
তাই কৈশোরকে প্রাপ্তবয়ক থেকে আলাদা করে দেখাটাই বোধহয় ভুল। কারণ, যখন নারীদের ক্ষেত্রে যুবা বয়সের অভ্যাসগুলো তৈরি হয়ে যায় বহু আগে থেকেই, অর্থাৎ স্কুলব্যাগ আর খেলনা নিয়ে খেলার বয়সেই, সেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে বিষয় টা একদম আলাদা। তাঁদের ছোটবেলা আর বড়বেলার পার্থক্য টা একদম স্পষ্ট। প্রশ্ন হল, এই বিভাজন ঠিক কীভাবে ঢুকে পড়ে শৈশবে, আর তার দাম মেয়েরা কীভাবে মেটায়? সেই উত্তরটা লুকিয়ে আছে আরেকটা পরিসংখ্যানের মধ্যে, যেখানে ছবিটা আরও স্পষ্ট আর আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
একটা পরিসংখ্যান বলছে, ছয় বছর বয়সী একটি ভারতীয় ছেলে আর একটি ভারতীয় মেয়ে— সামাজিক ভাবে দুজনেই প্রায় একইরকম ভাবে নিজেদের অবসর সময় কাটায়। অর্থাৎ ঘরের কাজে, ছোটদের দেখাশোনা এসবে দুজনেরই দিনে গড়ে পাঁচ মিনিট মতো সময় যায়। মানে এই কাজের ভার টা কারো রক্তে বা স্বভাবে নেই। এটা তৈরি করে দেওয়া হয়, ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে। সেটা তৈরি করে দেওয়াটা শুরু হয় ঠিক দশ বছর বয়স থেকেই। এরপর একটা মেয়ের বয়স যত বাড়তে থাকে, বাড়ির কাজে তাঁর সময়ও তত বাড়তে থাকে। পনেরো বছরে গিয়ে দাঁড়ায় দৈনিক প্রায় পঁচাত্তর মিনিটে। আর কৈশোর ফুরোতে ফুরোতে মেয়েটি অর্থাৎ মাত্র সতেরো বছর বয়সে, প্রায় একশো ত্রিশ মিনিট দিনে ব্যয় করে সংসারের কাজে। ছেলেদের বেলায় সেই একই যাত্রাপথ শুরু হয় ছয় বছরে পাঁচ মিনিট থেকে সতেরো বছরে গিয়ে মাত্র সতেরো মিনিটে। সংখ্যাটা একটা বিরাট ফারাক করে দেয়। ছয় থেকে নয় বছর বয়সের বাচ্চাদের মধ্যে মেয়ে-ছেলের এই কাজের অনুপাত ছিল ১.৬ গুণ, দশ থেকে চোদ্দোয় সেটা বেড়ে ৪.৫, আর পনেরো থেকে সতেরোয় গিয়ে সেটা দাঁড়ায় ৭.৫ গুণ। প্রতিটা জন্মদিনের সঙ্গে সঙ্গে যেন পার্থক্য টাও দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে।
অর্থাৎ ছয় বছর বয়সে যে ব্যবধান প্রায় অদৃশ্য, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সেটিই একটি শক্তিশালী Gender Gap-এ পরিণত হয়। ১৫–১৭ বছর বয়সে Unpaid Domestic and Care Work-এ মেয়েদের সময় ছেলেদের তুলনায় প্রায় সাড়ে সাত গুণ।
আর এর মুল্য টা মেয়েরা মেটায় নিজেদের অবসর দিয়ে। ছয় থেকে সতেরো বছর বয়সের মধ্যে মেয়েদের ঘরকন্নার সময় বাড়ে দিনে প্রায় ১২৪ মিনিট, আর ঠিক তার পাশাপাশি তাদের অবসরের সময় কমে যায় প্রায় ১১৫ মিনিট। প্রায় মিনিটে মিনিটে বিনিময়, যেন শৈশবটাই বদলে যাচ্ছে সংসারের কাজের মধ্যে দিয়ে। ছেলেদের বেলায় এই ক্ষতিটা অনেক ছোট, আর তাদের ঘরকন্নার সময়ও সেভাবে অপরিবর্তিত থাকে।
আশ্চর্যের বিষয় হল, পড়াশোনায় সময় দেওয়ার ব্যাপারে মেয়েরা বরং সামান্য এগিয়েই থাকে বেশিরভাগ বয়সেই ছহেলেদের তুলনাতে। তার মানে গল্পটা স্কুলকামাই এর নয়। মেয়েরা ঠিকই স্কুলে যায়, ঠিকই পড়াশোনা করে। কিন্তু যেটা হারিয়ে যায়, সেটা হল খেলার মাঠ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, বিশ্রাম, নতুন কিছু চেনার সময়, এবং নিজের সময়ের উপর নিজের যথেচ্ছ কর্তৃত্ব।
এই leisure loss-কে কেবল “অবসর কমে যাওয়া” বলে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। ICRIER-এর যুক্তি অনুযায়ী খেলাধুলা, বন্ধুত্ব, বিশ্রাম, অনুসন্ধান এবং নিজের সময়ের উপর নিয়ন্ত্রণ—সবই পরবর্তী জীবনের Self Confidence, Social Network, Physical Capability ও Agency গঠনের অংশ।
হেঁশেলেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে তীব্র ছবিটা। পনেরো থেকে সতেরো বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ৪২.৪ শতাংশ নিয়মিত রান্না করে, সেখানে একই বয়সী ছেলেদের মধ্যে এই সংখ্যা মাত্র ২.৯ শতাংশ। রান্নায় সময়ের হিসেবেও ফারাকটা নির্মম। এই বয়সী মেয়েরা রোজ প্রায় এক ঘণ্টা রান্নাঘরে কাটায়, আর ছেলেরা কাটায় মাত্র দু মিনিট।
রান্নার এই ব্যবধানটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি কেবল “কে কতক্ষণ রান্না করে” সেই প্রশ্ন নয়। এটি দেখায় যে ঘরের ভিতরের কাজ এবং বাইরের কাজ কীভাবে শৈশবেই Gender-Coded হয়ে যাচ্ছে।
ঘর মোছা ও ঘর পরিষ্কারের কাজেও একই ছবি। পনেরো থেকে সতেরো বছর বয়সী মেয়েদের ২৮.৮ শতাংশ এই কাজ করে, অন্যদিকে ছেলেদের মাত্র ২.৩ শতাংশ এই কাজে নিজেদের সময় খরচ করে। দশ থেকে চোদ্দ বছরের মদ্ধ্যেও মেয়েদের ১০.৭ শতাংশের বিপরীতে ছেলেদের মাত্র ১.২ শতাংশ এই কাজে অংশগ্রহন করে। কাপড় কাচার কাজেও তাই— কিশোরীদের ১৮.৫ শতাংশ, এবং ওদিকে কিশোরদের মাত্র ২.৫ শতাংশ। অথচ যে দুটো কাজে ছেলেরা মেয়েদের সমান বা তার চেয়ে এগিয়ে, সেগুলো হল মাঠের কাজ আর বাজার বা দোকান করা অর্থাৎ বাড়ির বাইরের কাজকর্ম যেটা লোকচক্ষুর সামনের কাজ। ঘরের ভেতরের কাজ মেয়েদের, বাইরের কাজ ছেলেদের— এই বিভাজনটা যেন এক অলিখিত নিয়মের মতোই স্পষ্ট হয়ে আছে সেই আদি অনন্তকাল।
ICRIER-এর পরিসংখ্যান থেকে একটি স্পষ্ট ‘Inside–Outside’ বিভাজনের ছবি ফুটে ওঠে।chi কিশোরীদের মূলত Kitchen, Cleaning ও Care Work-এর দিকে বেশি ঠেলে দেওয়া হয়, আর ছেলেদের তুলনামূলক বেশি দেখা যায় Farm Work ও Shopping-এর মতো Outward-Facing কাজে।
এই শৈশবের অভ্যাসটাই একদিন বড় হয়ে দাঁড়ায় জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে। ICRIER-এর ভাষায়, এই প্রক্রিয়ায় “boys are being trained for the world outside”—আর সেই training-এর বিপরীতে মেয়েরা ক্রমশ প্রস্তুত হয় ঘরের ভিতরের Unpaid Labour-এর জন্য।
PLFS 2025-এর সর্বভারতীয় হিসাবে, শ্রমশক্তির বাইরে থাকা মহিলাদের প্রায় ৪৪ শতাংশ Childcare এবং Homemaking-Related Personal Commitments-কে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ০.৫ শতাংশ।
একই তথ্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল শহরে এই নারী-পুরুষ ব্যবধান আরও প্রকট: ৫২.৫ শতাংশ মহিলা বনাম মাত্র ০.৬ শতাংশ পুরুষ; গ্রামে তা ৪০ শতাংশ মহিলা বনাম ০.৪ শতাংশ পুরুষ।
তাহলে সমাধান কী? গবেষকদের কথায়, লক্ষ্যটা মেয়েদের জীবন থেকে ঘরকন্নার কাজ পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া নয়। লক্ষ্যটা হল তার লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনটা সরানো। রান্না করা, ঘর সামলানো যেমন মেয়েদের শেখা উচিত, তেমনই সেলাই, মেরামতি বা টাকাপয়সার হিসেব রাখাও শেখা উচিত ছেলেদের। ইস্কুল থেকেই যদি প্রতিটা শিশুকে সমান সুযোগ দেওয়া যায় জীবনের এই ছোট ছোট দক্ষতাগুলো শিখতে, তাহলে বদলটা শুরু হতে পারে অনেক আগে থেকেই।
হরিয়ানার সেই মেয়েটার কথা মনে পড়ে যায় আবার, যে নিজে উদ্যোক্তা হতে চায়, অথচ যার মেয়ে ইতিমধ্যেই শিখে ফেলেছে সংসার সামলানোটাই তাঁর কাজ। এই চক্রটা ভাঙতে হলে বদলাতে হবে ঠিক ওইখান থেকেই— যেখানে একটা মেয়ে প্রথম হাতে তুলে নেয় খুন্তি, ঠিক দশ বছর বয়সে।
প্রাথমিক তথ্যসূত্র:
১) Time Use Survey 2025 ও Periodic Labour Force Survey 2025, Ministry of Statistics and Programme Implementation (MoSPI)
২) Girls conditioned from childhood to take up domestic burden - Tanu M. Goyal, Mohd. Tahoor, Shravani Prakash